এই দেশটা ভখনও পাকিস্তান যখন ‘দৈনিক বাংলাদেশে’র ৮ম সংখ্যা বের হয় ঠাকুরগাঁও থেকে। ১৯৭১ সালের ৩০ শে জুন বুধবারের এই সংখ্যার বিনিময় ছিল ১৫ পয়সা। স্বাধীন বাংলার স্বাধীন সংবাদপত্র এটি। পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক ছিলেন কাজী মাজহারুল হুদা। পত্রিকাটির ডানদিকে বক্স করে লেখা “ত্যাগ তিতিক্ষা ছাড়া কোন জাতিই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না-শেখ মুজিব।
যাহোক আজ আমার আলোচনার বিষয় হলো পত্রিকা সংশ্লিষ্ট আরেকজন কীর্তিমান মানুষকে নিয়ে। ঠাকুরগাঁওয়ের আরো কীর্তিমান মানুষদের সাথে সখতা যেন তাঁর। হাসি, আনন্দ আর আড্ডাবাজিতে আপন পরিচয়ে পরিচিত তিনি। ছিলেন সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে খুব সচেতন একজন। তিনি ছিলেন কবি। কবি নামেই বেশী পরিচিত। লিখতেন গল্প-কবিতা আর গান। তাঁর দুটা বিখ্যাত গান হলো “ হলদি কুটো নসা নসা/মেহেন্দী বাটো থোড়ায়-রে, হামার ময়নার হলদি দান/ হামার ময়নার বিহা-রে”!! আর “হামেরা ঠাকুরগাঁওবাসি-হামেরা ঠাকুরগাঁওবাসি”। বলছি আমাদের ঠাকুরগাঁওয়ের রুপ-লাবন্যের রুপকার, ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রকাশক, কৃষ্টি-সংস্কৃতির ধারক-বাহক আরেক কীর্তিমান পুরুষ আবুল হোসেন সরকারের কথা। কবি আবুল হোসেন সরকারের কথা।
আজ আপনাদের জন্য বলবো তাঁর মুক্তিকামী জনতার জন্য সাংবাদিক হবার গল্প। পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব নেবার গল্প। একদিন কথা হচ্ছিল আমাদের সবার প্রিয় জালাল ভাইয়ের সাথে। তিনি জেলার ট্রেজারিতে চাকরি করতেন। পাশাপাশি লেখালেখিও করতেন। মিষ্টি লেখালেখির জন্য ইতোমধ্যে সুপরিচিতও হতে শুরু করেছেন মানুষের কাছে। আর সেই সুবাদে তাঁর সাথে পরিচয় হয় কবি আবুল হোসেন সরকারের সাথে। শ্রদ্ধাপোষণ করতেন তাঁর সৃজনশীলতা, মননশীলতা, প্রগতিশীলতা আর কবি ভাবনাকে। শহরের পাশে যে আবুল হোসেন সরকার ডিগ্রি কলেজ, তার প্রতিষ্ঠাতা তিনি। আমি ঐ কলেজের একজন সহকারী অধ্যাপক। লেখালেখিও করি কবি’র মৃত্যুবার্ষিকীতে। তাইতো জালাল ভাই আমাকে বললেন, আমি কবি আবুল হোসেন সরকারের আরেকটি গুনের কথা জানি। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন তোমরা কি জান, তিনি সংবাদপত্রের একজন সম্পাদক ছিলেন। আমি বললাম, না। আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়কার ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ পত্রিকার একটা কপি আছে। তিনি সেটার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। কপিটা আমাকে দিয়েছিলেন আমার মামা। আমাদের সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মহসিন আলী। অত:পর পত্রিকাটি পাবার জন্য জালাল ভাইয়ের সাথে খুব খাতির জমাতে শুরু করলাম এবং একদিন পেলামও। শুরু করলাম পত্রিকাটি সম্পর্কে খুঁটি-নাটি জানতে।
পত্রিকাটি ঠাকুরগাঁও থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একটা সংবাদ বুলেটিন। তিনি পত্রিকাটিতে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। মাথাটা এলোমেলো হলো তখন,যখন জানলাম ঠাকুরগাঁও থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকায় বক্স করে সবিনয় নিবেদন করে বলা হয়েছে, আপনাদের হাতে যথাসময়ে ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ তুলে দিতে না পারায় আমরা দু:খিত। সকল অসুবিধা কাটিয়ে আগামীতে আপনাদের হাতে যেন পত্রিকা পৌঁছায় সে ব্যপারে আমরা সচেষ্ট। পত্রিকাটিতে অবারও বক্স করে লেখা-‘দৈনিক বাংলাদেশ’-এর জন্য সর্বত্র সংবাদদাতা আবশ্যক। দু’কপি পাশপোর্ট-ছবি সহ অবিলম্বে যোগাযোগ করুন। আরো একটা বক্সে- যোগাযোগের ঠিকানা দেয়া আছে। শ্রী অসীম আনন্দ দে বিশেষ প্রতিনিধি, ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ থানা কলোনী :: ইসলামপুর (পশ্চিম দিনাজপুর)।
এটা পড়ে শুরু হলো আমার দ্বান্দ্বিক অবস্থা। ঠাকুরগাঁও থেকে প্রকাশিত অথচ সর্বত্র সংবাদদাতা আবশ্যক ও
তার যোগাযোগের ঠিকানা হলো ইসলামপুর(পশ্চিম দিনাজপুর)। আবার তাতে পশ্চিমবঙ্গও লেখা নাই, ভারতও
লেখা নাই। এর অর্থ কি দাঁড়ালো তাহলে, আমার কাছে এবং আপনার কাছে ? হঠাৎ মনে হলো, আমিতো এরকম একটা কিছু পড়াই। মনে পরেছে সেটা। প্রবাসী সরকার আর তার গঠন। তাই আমার কাছে এর অর্থ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী সরকারের গঠন প্রক্রিয়ার মতো মনে হলো। সব আয়োজনের চুড়ান্ত আয়োজন দেশের মাটিতেই হতে হবে। অস্থায়ী স্থায়ী নয়, আমরা যে স্থায়ী কোন এক জনপদের মানুষ। যে জনপদ আজ নিরস্ত্র, ব্যথিত, রক্তাক্ত। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় শাষকের গুলির সম্মুখে অবিরত অবিরাম। তাই সখতা থাকতে হবে দেশের মাটির সাথে। এ মাটি যে আমার মা। মাকে যে ঐ জালিম সরকার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করছে প্রতিনিয়ত। যোগাযোগের ঠিকানাটা তারা দেশের মাটিতেই দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে দিয়েছেন ক্ষণিকের স্থায়ী আসলে অস্থায়ী কোন ঠিকানায়। ঠিকানাটা দেশের মাটিতে দিলে যে সমস্যা আছে, এ কথা যেন সম্পাদনা পরিদদের জানা। জানা কবি আবুল হোসেন সরকারেরও। তাহলে একবার ভাবুনতো কতো ত্যাগ-তিতিক্ষা আর গোপনীয়তা রক্ষা করতে হতো পত্রিকাটা প্রকাশে। কত সংগ্রাম আর সাহসিকতার পরিচায়ক কর্ম ছিল এটি।
শোষিত, নির্যাতিত, নিপিড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য কথা বলার সাহস বুকে ধারন করতেন তিনি। সে সময় দেশে যে সরকার ছিল, সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া সরকার আর তাদের দমন-নিপিড়ন আর গণহত্যা যেন গোটা বিশ^ সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এত ভয়-ভীতি, অত্যাচার, দমন, নিপিড়ন, বৈষম্য আর গণহত্যা কবি আবুল হোসেন সরকারকে বিচলিত করতে পারেনি বিন্দু মাত্রও। বরং তিনি নিজেকে তৈরী করেছেন একজন দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী, সাহসী পুরুষ রুপে। হয়েছেন দূর্গম, দূর্নিবার ঠিক যেন নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মতো।

এবার আসি পত্রিকার গর্ভে। পত্রিকাটির কয়েকটি শিরোনাম আমাকে উজ্জীবিত করেছে। করেছে উদ্বেলিত। কয়েকটি শিরোনাম বলি তাহলে যেমন-‘মুক্তিফৌজের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন’। স্টাফ রিপোর্টারের এই লেখায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এখানে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আকবর হোসেন অবিলম্বে তার সাথে যোগাযোগের নির্দেশ দিয়েছেন। পত্রিকাটিতে এবার সারা দাও- শিরোনামে একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকার সোমবারের সা¤্রাজ্যবাদীদের দালাল, প্রতিক্রিয়াশীল পাঞ্জাবী জঙ্গি শাসকদের যোগ্য-প্রতিনিধি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষনকে বিশ্লেষন করেছেন। ভাষ্যকার বলেছেন,‘ সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটাইয়া বিশে^র দ্বিতীয় হিটলার পরোক্ষভাবে জানাইয়া দিয়াছেন যে, বাংলাদেশের ব্যাপারে তিনি কোন সমাধান চাহেন না। এ ব্যাপারে কাহারো হস্তক্ষেপেও তিনি বরদাস্ত করিবেন না। ভাষ্যকার বলেছেন, আমরা ইহা জানিতাম বলিয়া বিস্মিত হই নাই।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কবি আবুল হোসেন সরকারের এইযে বিশ্লেষণধর্মী লেখার প্রতি একান্ত দূর্বলতা, তাতে তিনি যে একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা তাতে কোন সন্দেহ নাই। মাঝে মাঝে মনে হয় তিনিই বুঝি এর লেখক। তাঁর সাথে আমি যতটুকু মিশেছি তাতে তাঁকে কোন দিন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে শুনিনি। আমি জানিনা তাঁর মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট আছে কি না কিন্তু দেশের প্রতি তাঁর ভক্তি-শ্রদ্ধা, আনুগত্য-বিনয় যেন এক খাঁটি দেশপ্রেমিকের পরিচায়ক। তবে তাঁকে যেমন কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করতে দেখেছি সবসময়। তেমনি ভয়ে আর শঙ্কায় থাকতেও দেখেছি। কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতার কখন যে কি হয়ে যায় তার জন্য। দেখেছি, তিনি ভালোবাসতেন কবি পরিচয়ে পরিচিত হতে। আর বৈষম্য, নিপিড়ন, শোষণ, নির্যাতন, বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মুক্তিযুদ্ধ, গেরিলাযুদ্ধ, গণহত্যা, স্বাধীনতা এই শব্দগুলো তিনি ধারণ করতেন বুকে। অন্তরের অন্ত:স্থলে। কবি বেঁচে থেকো তুমি লাখো বাঙ্গালীর হৃদয়ে হৃদয়ে । আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে।
পত্রিকাটিতে ‘বিবেক’ তাঁর “বিবেকের জবানবন্দী” লেখায়, ইসলাম ও মুসলিম শব্দদটিকে যে সাইনবোর্ড আর মুখোস হিসেবে ব্যাবহার করেছেন স্বৈরাচারী পাক-সরকার এবং তা শুধু বাংলায় নয় তা সারা বিশ্বব্যাপী তার একটা চমৎকার,তথ্যবহুল এবং বিশ্লেষণধর্মী লেখা তিনি উপহার দিয়েছেন পাঠকদের। জানিনা লেখাটি কে লিখেছেন। তবে আমার দৃষ্টিতে স্যার । আমাদের প্রিয় কবি, আমাদের শব্দযোদ্ধা, আমাদের প্রতিবাদী সাহসী সৈনিক, আমাদের হৃদয়স্পর্শী লেখক কবি আবুল হোসেন সরকার।
এই নিভৃতচারী কবি, দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার ধনগাঁও গ্রামে ১৯৪৮ সালের ১২ অক্টোবর জন্মগ্রহন করেন। মরহুম আজিমউদ্দীন সরকার আর মরহুমা রাহেলা খাতুনের আদরের এই সন্তান ঠাকুরগাঁও হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করে বাংলায়(সম্মান) ও স্নাতকোত্ত্বর ডিগ্রি অর্জন করেন রাজশাহী গভর্মেন্ট কলেজ থেকে।
পরে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন আর ভাবেন এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃকির কথা। তিনি জন্মের পর দেখেছেন মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নেবার ষড়যন্ত্র। দেখেছেন চুয়ান্ন,ছাপ্পান্ন,ছেষট্রি, উনসত্তর, সত্তর আরো কত উত্তাল দিন এই জনপদে। তাইতো তিনি নিজেকে তৈরী করেছেন ইস্পাতকঠিন মনোবলে। হয়েছেন অগ্নিচেতা এক বীরপুরুষ। সাহসী, প্রতিবাদী আর কৌশলীও। কৌশল করেছেন মুক্তিযুদ্ধকে সফল করবার জন্য। মক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হয়ে বাংঙালীর মনোবল শক্ত করতে বেছে নিয়েছেন ভিন্ন এক প্রতিবাদী ক্রিয়া-কর্ম। বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতা। দ্বায়িত্ব নিয়েছিলেন পত্রিকার মত শক্তিশালী গণমাধ্যম সম্পাদনায়। সেই সময়ে । যে সময় ছিলোনা এই সময়ের কোন আয়না ঘর। কিন্তু ভিন্নরুপ ছিল তার। আরো ভয়ংকর ও জঘন্যরুপে ছিল তার প্রকাশ। ছিল শোষণ, নিপিড়ন, নির্যাতন, বৈষম্য, গুম, খুন আর গণহত্যায়।
যাহোক ভুলেগেছি সেই পত্রিকাটির কথা। ‘দৈনিক বাংলাদেশ’। ইতোমধ্যেই আরো সাতটি সংখ্যা বের হয়েছিল নিশ্চয়ই। এটি অষ্টম সংখ্যা যে। পত্রিকাটির গর্ভের আরো কিছু কথা যে না লিখলেই নয়। একটি শিরোনাম ছিল ‘সব সেক্টরে তমুল লড়াই ঃ মুক্তিফৌজ সকল বিপত্তি অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে’-।। দৈনিক বাংলাদেশ রিপোর্ট-এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পবিত্র মাটিকে শত্রুমুক্ত করার জন্য ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেল, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র এবং কৃষক-শ্রমীকের সমন্বয়ে গঠিত মুক্তিফৌজ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম আরো দৃঢ়তর করেছে বলে খবর এসেছে। রিপোর্টটিতে এ অঞ্চলে এবং দেশে মুক্তিফৌজের সাফল্য ও খান সেনাদের বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে। যা শোককে শক্তিতে রুপান্তরিত হতে সাহায্য করেছে এ অঞ্চলের মুক্তিকামী নিরীহ সাধারণ জনগণ ও মুক্তিফৌজদের। তাইতো বলতে হয়, কবি মোর গেরিলা যোদ্ধা। এক ভিন্ন রকমের গেরিলা যোদ্ধা। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা তোমার প্রতি হে গেরিলা।

সম্পাদক তার সম্পাদকীয়তে‘আপোষ নাই-’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণধর্মী কলাম লিখেছেন। লেখাটিতে তিনি বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব, জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার এবং বিশ্ব জনমত সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। একটি উদ্ধৃতি হলো, পাকিস্তানে নির্বাচিত সরকারকে স্বীকৃতি না দিয়ে-ইসলামাবাদ সরকারের এই মনোভাব যে আদৌ শুভ নয় একথা বিশ্বের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা স্পষ্ট ভাবে ব্যাক্ত করেছে। নেতৃবৃন্দ পর্যন্ত এ সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া বলে মনে করছেন, ইয়াহিয়া সরকার পাকিস্তানের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নন, একজন বেতনভোগী কর্মচারী মাত্র।
পত্রিকাটিতে শিরোনাম চয়নে যেমন রয়েছে মুন্সিয়ানার পরিচয় তেমনি রয়েছে লেখনির ভিন্নতা ও তার ক্ষুরধার। যেই কাজটি করতে হয়েছে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবুল হেসেন সরকার স্যারকে। ‘বিস্ফোরণের নেপথ্য কাহিনী’ নামে আরেকটি শিরোনামে ছাপা হয়েছে আব্দুল বারী প্রদত্ত কিছু অভিজ্ঞতা, আলাপচারিতা আর বাস্তব পরিস্থিতির বিশ্লেষণধর্মী উপাখ্যান। এখানে রয়েছে মাঝারী গড়ন, গায়ের রং ফরসা আর আটত্রিশ বছর বয়সী কোয়ার্টার মাষ্টার মুসলিম আলীর পনের জন সঙ্গী নিয়ে পাঁচ শতাধিক পাক সেনার বিরুদ্ধে হাতিয়ার ধরার গল্প। প্রতিবেদনে তিন কলামের একটি বক্স করে দেয়া হয়েছে- ‘এক রাতে হঠাৎ পাঁচ শতাধিক সয়ংসম্পূর্ণ ফাষ্ট ফিল্ড রেজিমেন্ট দিনাজপুরে এসে উপস্থিত। তারা ছাউনি ফেললো স্থানীয় সার্কিট হাউজে। তাদের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ওয়ার্লেস সেটটি বসালো ই,পি,আর হেড কোয়ার্টারে। টিক্কা খান যেদিন ঢাকায় এলো এই এফ,এফ,আরের সন্দেহজনক গতিবিধি বেড়ে গেলো’।
গোটা পত্রিকা জুড়ে রয়েছে সমসাময়িক ঘটনাবলি আর রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ। কতটা সাহসিকতার ক্রিয়া-কর্মের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি সেই সময়ে। যেই সময়ে এ অঞ্চলে চলছিল নির্বিচার গণহত্যা। স্যার! মানে কবি আবুল হোসেন সরকার। কতটা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ একজন মানুষের সম্ভব জান্তা সরকারের অন্যায়-অত্যাচার, নিপিড়ন-নির্যাতন আর গণহত্যার প্রতিবাদে সড়ব হতে। তিনি এই নরপিশাচ-স্বৈরাচারী সরকারের টার্গেটে পরিণত হয়ে জীবনটা হারাতে পারতেন! পারতেন! তিনি সেটা ভালোভাবেই জানতেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি শত্রুপক্ষের সাথে সামনা-সামনি যুদ্ধ করেছেন কিনা আমার জানা নাই। তবে তিনিযে যুদ্ধ করেছেন একথা অস্বীকার করবো কিভাবে ? যুদ্ধ করেছেন! ভিন্ন রকমের এক গেরিলা যুদ্ধ। কবি তুমি নতুনের অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থেকো যুগ থেকে যুগান্তরে। যেকোনো শৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হোক তোমার মত করে আমাদের ভাবনাগুলো। উচ্চারিত হোক তোমার মত করে আমাদের কণ্ঠস্বর।
পত্রিকাটিতে দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়াও দূর্ভিক্ষের ভয়াবহ পদধ্বনি প্রকাশিত হয়েছে, ঢাকা থেকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টারের প্রতিনিধি মি: হোয়ার্ড হিটেন-এর তথ্যের ভিত্তিতে। প্রতিবেদনটি করেছেন দৈনিক বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিনিধি। তিনি জানান, পূর্ববঙ্গ(বাংলাদেশ) এমনিতেই দু’মিলিয়ন টনের খাদ্য ঘাটতি ছিল। মার্চের গোলযোগে সে ঘড়তি দাড়াচ্ছে তিন মিলিয়ন টনে। এছাড়াও ঝড়,সামুদ্রিক জলোচ্ছাসে উপকুলীয় এলাকায় ফসল চাষে ব্যাঘাত, গোলযোগপূর্ণ দেশে কৃষকদের ভয় এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক ফসল নষ্ট এসবকে কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে। রয়েছে চীন ও আমেরিকার বর্তমান নীতির কঠোর ভাষায় ন্যাপ প্রধান মাওলানা ভাসানীর তীব্র নিন্দা।
চার পৃষ্টার এই সংবাদ বুলেটিনে রয়েছে সব ধরনের খবর পরিবেশনের দক্ষতা। রয়েছে শৈরাশাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য মুক্তিফৌজদের মাঝে উৎসাহ, উদ্দীপনা ছড়িয়ে দেয়া সহ দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নানা সম্ভাবনা-সাফল্যতার আর কৌশলের খবরা-খবর। একজন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে আমাদের স্যার কবি আবুল হোসেন সরকার এ কাজটিই করেছিলেন সিদ্ধহস্তে। পত্রিকাটির অবয়বে ছিল আধুনিকতার পরিচয়। খবরের প্রাধান্য অনুযায়ী বুলেটিনে যায়গা নির্ধারণ ছিল চমকপ্রদ। প্রথম পাতায় খবরের শিরোনামে ছিল পাঠকদের আকর্ষণ করার কৌশল। এসব কিছু মিলিয়ে কবি আবুল হোসেন সরকার তার মেধা ও মননের পরিচয় দিয়েছেন এই সংবাদ বুলেটিনে।
শেষ করছি একটি মজার খবর দিয়ে। ষ্টাফ রিপোর্টার একটি শিরোনাম করেছেন এভাবে-‘একি কথা শুনি আজ’- খবরটি মজার, পড়–ন তাহলে-তেঁতুলিয়া-২৫শে জুন, পাক হানাদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জামাতে ইসলাম ও মুসলিম লীগের নেতারা এখন মুক্তাঞ্চলে আসতে চাইছেন। কারণ এবার হানাদারদের নজর তাদের উপর। এভাবে মুক্তাঞ্চলে আশ্রয় লাভের আশায় দিনাজপুর জেলা জামাতে ইসলামের আমীর(সভাপতি) মাওলানা তমিজ উদ্দীন মুক্তাঞ্চলে চিঠি পাঠিয়েছেন। হ্যাঃ হ্যাঃ হ্যাঃ……….।
লেখক: খোদাবক্শ.ডাবলু, সহকারী অধ্যাপক, আবুল হোসেন সরকার ডিগ্রি কলেজ, বরুণাগাঁও, ঠাকুরগাঁও।
প্রতিকৃতি: কাদিমুল ইসলাম যাদু ।